খ্যাটন সঙ্গী
দামু মুখোপাধ্যায়
সারা সকাল বনবাদাড় ঠেঙিয়ে গ্রামে ঢুকতেই ঝেঁপে বৃষ্টি। চনচনে খিদে নিয়ে ডাইনিং হলে পৌঁছে খবর পেলাম, আজ খাঁটি গারো ডিশের সম্ভার। শুরুতে ‘নাখাম বিচি’। শুটকি মাছের স্বাদু স্যুপ। গারো লবজে “নাখাম” শব্দের মানে মাছ। যাঁদের শুকনো মাছে অরুচি, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, বাঙালির লইট্যা শুটকি-র গন্ধ এতে পাবেন না। বরং নানাবিধ মশলার সমাহারে অল্প ঝাল হলেও স্বাদ অতুলনীয়। এরপর গরম ভাতের সঙ্গে ব্যাম্বু শ্যুট সমৃদ্ধ―দোও কাপ্প। বাদামি ঘন গ্রেভি মাখা দেশি মুরগির টুকরোর পরতে পরতে স্বর্গসুখ। দীর্ঘক্ষণ দমে রান্না করার ফলে মাংস নরম তো হয়েইছে, তার ভিতর সেঁধিয়েছে মশলার কারিকুরি। উগ্রগন্ধী দুর্লভ স্বাদের মাংসখণ্ডের স্বাদ হ্যাচারিজাত শহুরে চিকেনের মতো চরিত্রহীন নয়। ভোজনসঙ্গী আনসুপ জানালেন, গারো রান্নার দুরন্ত ম্যাজিকের পিছনে রয়েছে দুটি অমোঘ উপাদান—বাঁশ ও খাই সোডা। জানা গেল, কচি বাঁশ, বাঁশের গায়ে গজিয়ে ওঠা ছত্রাক এঁদের বিশেষ প্রিয়। আর বাঁশ পোড়া ছাই জলে গুলে, তারপর বাঁশের চোঙে ছেঁকে পরিশুদ্ধ করে খাওয়ার সোডা তৈরি করেন উপজাতীয়রা। তীব্র ঝাল পোষ মানাতে ও রসনায় অভিনব স্বাদ আনতে তার যে জুড়ি নেই, সে প্রমাণ পেয়েছি সদ্য। তবে শুনলাম, ইদানিং সোডিবাইকার্বের উপদ্রবে চিরাচরিত প্রথায় ছেদ পড়ার উপক্রম।
দুপুরটা গ্রামে ঘুরে কাটল। মুরুব্বিরা বসলেন আমার সঙ্গে হবু বিদেশি অতিথিদের থাকা-খাওয়ার প্ল্যান কষতে। নকরেক পিকের আড়ালে সূর্যদেব আড়মোড়া ভেঙে বিদায় নিতেই ঝুপ করে অন্ধকার ঘনাল। ব্যাটারির লণ্ঠনের আলো ঘিরে জমল মদিরা-সহ আড্ডার আসর। সঙ্গে চাট পর্ক ফ্রাই আর মাছপোড়া। শুয়োরের চর্বি-মাংস সমেত বিস্কুট আকারের বর্গাকৃতির পাতলা পিস ভুট্টার আটা-লঙ্কাগুঁড়ো-নুন-সোডার ব্যাটারে চুবিয়ে ছাঁকা তেলে ভাজা। বাইরের মুচমুচে খোল ভেদ করলেই রসালো তুলতুলে মাংস। দারচিনি-আদা-রসুনের রসে জারানো পাঙাশ মাছের খণ্ড পাতায় মুড়ে কাঠকয়লার আগুনে পুড়িয়ে নেন গারোরা। মুখে দিলে মাখনের মতো গলে যাওয়া সে দেবভোগ্য পদ অবিস্মরণীয়।
এই আসরেই প্রথম শুনতে পেলাম ‘মানডে বুরুং’-এর কথা। নেপালে যেমন ‘ইয়েতি’, মার্কিন মুলুকে ‘বিগ ফুট’, অস্ট্রেলিয়ায় ‘ইওয়ি’, তেমনই উত্তর পূবের পাহাড়ে মানডে বুরুংকে নিয়ে চালু অগুনতি গল্প-উপকথা। দশ ফিট লম্বা, তিনশো কিলোগ্রাম ওজনের এই কিংবদন্তীসম বনমানুষের দেখা পেয়েছেন, এ অঞ্চলে তেমন বাসিন্দার সংখ্যা নাকি খুব কম নয়। কেউ বলেন হিংস্র, কারও মতে ওরা বড়ই লাজুক। তবে এতজন চাক্ষুষ করলেও এই আদিমানবের অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীর তরজা অন্তহীন। শুনলাম, মাস ছয়েক আগে গ্রামের এক কিশোর জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে গিয়ে কিছু দূরে এমনই এক প্রাণীর দেখা পেয়েছিল। তার বিবরণ অনুযায়ী, বিশালাকৃতির সেই দু-পেয়ের সারা দেহ কালচে বাদামি পুরু লোমের আস্তরণে ঢাকা। গাছের ডাল ভেঙে রস খাচ্ছিল সে। এদিকে, তাকে সচক্ষে দেখতে পেয়ে ছেলেটির ভয়ে আত্মারাম প্রায় খাঁচাছাড়া। আতঙ্কে অসাড় হয়ে যাওয়া হাত ফস্কে কুড়োনো কাঠ পড়ার আওয়াজ পেয়ে মূহুর্তের জন্য ফিরে তাকায় মানডে বুরুং। পাঁশুটে চোখে ঝিলিক মেরে যায় জান্তব আক্রোশ। কিন্তু তারপরই দুদ্দাড়িয়ে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয় লোমশ দৈত্য। অন্তত তেমনটাই বাড়ি ফিরে জানায় ভয়ে কাঁপতে থাকা ছেলেটি।
ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে আসতেই ঘিরে ধরল নিকষ জঙ্গুলে রাত। জোনাকিরা সাধ্যমতো আলো জোগাচ্ছে। ট্যুরিজম সেন্টারের বাইরে তারাভরা চন্দ্রাতপ আড়াল করে দাঁড়িয়ে দেবদারু, ইউক্যালিপ্টাস, বুনো আম আর অর্জুনের রহস্যঘন জটলা। ওই নিশ্ছিদ্র গহন থেকেই কী ভিনদেশির ওপর নজর রাখছে ঘন ভ্রুয়ের নীচে কোটরে বসা একজোড়া কটাচোখ! ডিনারের ডাক আসতে হাঁফ ছাড়লাম।
ওবেলা গারো খাবার, তো এবার পালা খাসি রসনার। শুয়োরের চর্বিতে রান্না করা পর্ক ফ্রায়েড রাইসের খাসি নাম ‘জাডো’। সঙ্গে বিফ কাটলেট ‘ডহ শিয়াং’। আহা যেমন অপূর্ব চেহারা তেমনই অদ্বিতীয় তার স্বাদ। আদা-লবঙ্গ-শুকনো লঙ্কাবাটা দিয়ে কষা কুচোনো গোমাংস অমৃতসম। লেজুড় হিসেবে শুকনো মাছের টক-ঝাল চাটনি। এর পর মঞ্চে আগমন দহজেম-এর। শুয়োরের মাংসের এই পদ না খেলে জীবনের অনন্য অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতাম সন্দেহ নেই। এই রান্নায় পেঁয়াজ-আদা-রসুনের সঙ্গী তেজপাতা আর কালো তিলবাটা। তবে সবার আগে মাংস ‘স্মোক’ করে নেওয়া হয় বলে গোটা পদটিই অসাধারণ এক ধোঁয়াটে সুঘ্রাণে ভরপুর। এই পদটি অবশ্য জাডো নয়, পরিবেশিত হল ‘পুঠারো’-র সঙ্গে। রসিকজনের মতে, চালের গুঁড়ো ভাপিয়ে তৈরি এই দুধসাদা প্যানকেকের সঙ্গতেই রূপ খোলতাই হয় মশলাদার দহজেম-এর।
খাওয়া সেরে বাগানে পায়চারি করতে করতে চুরুটে টান দিচ্ছি, এমন সময় আঁধারমাখা বন চিরে ঠিকরে বেরোল হাড়হিম করা অচেনা আর্তনাদ। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে শরীরের রক্ত যেন জল হয়ে গেল। আঁধার পেরিয়ে তবে কী আমার দিকেই ধেয়ে আসছে লোমশ আদিমানব? তার হলুদ চোখের তারায় কী উপচে উঠছে সভ্যতার ভণ্ডামিতে আশ্রয় নেওয়া উত্তরপুরুষের প্রতি তীব্র ঘৃণা! অবশ হয়ে আসা দেহ কোনওরকমে হিঁচড়ে বারান্দায় তুলতেই মুখোমুখি কেয়ারটেকার সাংমার সঙ্গে। মুখ-চোখের অবস্থা দেখে আর জড়ানো সংলাপে “বুরুং” শুনে মুচকি হেসে সে জানায়, হুলক গিবন নিয়ে চিন্তা নেই, রাত অনেক হল, শুয়ে পড়ুন, তবে― কোনও শব্দ শুনলে ঈশ্বরের দোহাই, দরজা খুলবেন না। ভাগ্যিস সঙ্গে ঘুমের ওষুধ ছিল!
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি