আধেকজান
শতদল মিত্র
প্রচ্ছদ : প্রশান্ত সরকার
যে আখ্যান এমনই বলে :
"উদ্দালক চোখ ভরে দেখে সে উৎসবের আপাতত উদাসীন সৌন্দর্যের ফুটে ওঠা-- বৃষ্টি ধোয়া শিবতলার রঙিন কাগজের শিকলে-আম্রপল্লবে সেজে ওঠায়, মন্দিরের গর্ভগৃহে কয়েকঘর বামুন-কায়েত রমণীর শিবপুজোয় আর আটচালায় সন্ন্যাসীদের অলস যাপনে, ডিজে-র অকাল স্তব্ধতায়। এ উদাসীনতা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে যেন নিতাই ডোমের ছেদহীন-একটানা খেদোক্তিতে, যে খেদ শিবমন্দিরের দখিনবাগে মেঠোপথের ওধারে প্রাচীন পাকুড়গাছের তলায় পরিত্যক্ত ধরমরাজের আটন নিঃসঙ্গ জাগায়।
--হুস! হুস! শালো গিরগিটি! ন্যাতার মারি তোর! রঙ বদলানো আবার! এখুনি সবুজ তো তেখুনি লাল, তাবাদে চক্কু পলকে মাটি রঙ! ওহ, ঘাড় ঘুরিয়ে রোখ দিখায় আবার!
বৃদ্ধ মানুষটি ঢিল ছুড়লে সরীসৃপটি ছুটে মাঠের আলের আড়াল নেয়, এ অবসরে নিতাই ডোম কোদালের হাতলে শরীরের ভর রেখে একটু জিরেন নেয় যেন, সে ঢঙে বুড়ো ফুসফুস তার বাতাস পায়, ফলে তার চনমনে দেহ আবারও হাতে কোদাল ধরে বজ্রমুষ্টিতে, সে মুষ্টিতে কোথায় যেন প্রাণের আরাম লেখা থাকে, মনের শান্তি। ধরমতলার মাটি চাঁচে পরম মানুষটি মায়ায়, সে মায়ায় সূর্যের আলো খুনসুটি করে পাকুড়ের জল-ধোওয়া চিকন পাতার সনে— আলোছায়ার আলপনা ঝিরঝির ভিজিয়ে দেয় বৃদ্ধ শরীরটি, কেননা তখুনি হাওয়া বয়। কোদালের ঢিমে ছন্দে মুখ চালায় নিতাই ডোম, বীরবংশী যে।
--শিবপুজো কচ্ছে! তা কর কেনে শিবপূজো। আমরাও করেচি আজেবন। তা বলে বাপ-পিতিমোর ধম্মরাজকে ভুলে যাবি? আরে খালভরা, নামুনে, বাঁশবুকোরা—ডোম-বাগদির আসল দ্যাবতা ই ধম্মরাজ ঠাকুর। না, জাতের দ্যাবতাকে অছেদ্যা করে জাতে ওটার পচিষ্টা! বামুন-কায়েত হবে সব! উদ্দারেনপুর থিকে পবিত্ত গঙ্গাজল আনবে শিবের লেগে! সিনিমা-টিবির হুজুগ! ওরে বোকারা বুঝিস না কেনে—নারানতলায়, দুর্গাতলায় তোদের উটতে দেয়? শুধু বিসজ্জনে ঠাকুর কাঁধাবার লেগে তোদের পেয়োজন। তা, তখুন তো ঘট বিসজ্জন সারা। পতিমের পরানটোই তো বিসজ্জন হয়ে গেইছে।
আপনমনে বকে আর কোদাল চালায় নরম হাতে নেতাই কামরেড, দু-দুক্ষেপের পঞ্চাত্ যে,-- অধম্ম। অধম্ম সব। অধম্মে গেছে পিথিমিটো। এতো অধম্ম সইবে না, তা বলে দিছি। তখুন এ বুড়োর কথাখান মান পাবে।
একটু থামে সে, শ্বাস নিতেই যেন, আবারও নতুন উৎসাহে কোদাল চালাতে, সে ধরতাইয়ে কথা বুনতে।
--তুরা বুঝিস বুঝি ই বুড়ো কিছুটি জানে না। পঞ্চগাঁ জানে আর আমি জানতে লারবো! উ চকচকির ডাঙাটোকে খাবলে, কামড়ে শেষ করে দিলি। কী না, মোরাম চালান দিয়ে দুটো ট্যাকা।! মা-মেগোরা মাটি-মা’টোর ইজ্জত লিলি দুটো পয়সার লালচে। মায়ের পারা লদীটোকেও সম্বচ্চর বালি তুলে, বালি তুলে বারোভাতারি করে ছাড়লি! ... পঞ্চাতের চোকের ছামুতে, পাটির আশকারায়। ভাবলি, শিবের মন্দিরটো বিলিতি মাটি আর পাথর দিয়ি গড়ে দিলিই সকল পাপ মকুব। জেনে রাখিস মনেতে পাপ বাপকে ছাড়ে না। অধম্ম সইবে...
বাক্যি হরে যায় সহসা নিতাইয়ের, যেহেতু তার কোদালে উঠে আসে পোড়া মাটির এক খোঁড়া অশ্বমূর্তি, যা স্তব্ধতা আনে তার আমনদেহে পুরাণ ঘোর জাগিয়ে, যে ঘোরে সে তার মাথায় জড়ানো গামছাখানি খুলে মাটি মোছে সে পুরাণ মূর্তির, সে ভঙ্গিতে আদর লেপা থাকে যেন। ক্ষণ পরে ঘোর–আচ্ছন্ন নিতাই তড়িঘড়ি কুলুপুকুরের ঘাটের পানে ধায়, সে পথ ভাঙায় তার দু হাতের অঞ্জলিতে শুয়ে থাকে মাটির প্রতীকটি পরম মায়ায়, সে মায়ার টানেই নিতাই গোড়ালিডোবা জলে কোনোগতিকে চান করায় তার পড়ে পাওয়া স্মৃতিচিহ্নটিকে, মনে এ বাসনা হেনে যে বিকেলে ধরমগড়ের বিলে জাদুরঘাটায় বাণেশ্বরকে চান করার কালে সেও চান করবে এই ধম্মবাহককে। "
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি