শ্রেষ্ঠ গল্প
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
[সম্পাদকের কথা : 'শ্রেষ্ঠগল্প' প্রসঙ্গে শৈলজানন্দ লিখেছিলেন, "লেখকের কোন লেখাটি শ্রেষ্ঠ কোনটি নিকৃষ্ট, তার বিচার লেখক নিজে করতে পারেন না। করা উচিতও নয়। সাহিত্যের বিচারে ভালো লাগা বা মন্দ লাগাই হল শেষ কথা। তবে আমার রুচির সঙ্গে আপনার রুচি হয়তো মেলে না। আমার যা ভালো লাগে, আপনার তা ভালো নাও লাগতে পারে। সুতরাং অপরের রুচির ওপর নির্ভর করতে হয় যাদের, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "জগতে সকলের চেয়ে অরক্ষিত অসহায় জীব হল তারাই, যারা সাহিত্যরচয়িতা। মৃদুস্বভাব হরিণ পালিয়ে বাঁচে; কিন্তু সাহিত্যিকের পালাবার উপায় নেই; ছাপার অক্ষরের কালো জালে সে ধরা পড়েই আছে। এ নিয়ে আক্ষেপ করে লাভ নেই। রুচির মার যখন খাই, তখন চুপ করে সহ্য করাই ভালো। সাহিত্যিকের পক্ষে সেটাই উপরি-পাওনা।"
১৯১৮ সাল থেকে শৈলজানন্দ গল্প লেখা শুরু করেন, আগে অবশ্য কবিতা লিখতেন। তাঁর এই সময়কার গল্পগুলি প্রকাশিত হয়েছিল 'মাধুরী', 'মোসলেম ভারত', 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা', 'উপাসনা', 'শাওগাত', 'নওরোজ' প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায়। ১৯১৯ সালে শৈলজানন্দের প্রথম গল্পগ্রন্থ 'মর্মবাণী' প্রকাশিত হয়। এরপর 'আমের মঞ্জুরী' (১৩৩০), 'অতসী' (১৩৩২), 'নারীমেধ' (১৩৩৫), 'বধূবরণ' (১৩৩৬), 'কয়লাকুঠি' (১৩৩৬), 'পৌষপার্বণ' (১৩৩৮) প্রভৃতি অজস্র গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।
যাই হোক, ১৯১৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত শৈলজানন্দ প্রায় চারশো'র মতো গল্প লিখে গেছেন। এখনও কত গল্প যে অগ্রন্থিত রয়ে গেছে পত্র-পত্রিকার পাতায় তার কোনো সার্বিক হিসাব পাচ্ছি না। এই বিপুল গল্পসম্ভারের মধ্যে থেকে শ্রেষ্ঠ গল্প নির্বাচন করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। এক্ষেত্রে সম্পাদকের রুচি, ভালোলাগা, মন্দলাগা এসবের একটা সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। তবে 'শৈলজানন্দের জীবন ও সাহিত্য' নিয়ে দীর্ঘকালের গবেষণাকর্মে যুক্ত থাকার সূত্রে বলা যায়, যে গল্পগুলি এই সংকলনে দেওয়া হল সেগুলি ছাড়াও আরও অন্তত ৫০টি গল্প এতে স্থান পেতে পারত, কিন্তু তা সম্ভব নয়।
শৈলজানন্দের গল্পের তিনটি পর্ব, যথা-প্রথম যৌবনে লেখা 'প্রেম-ভালবাসা-রোমান্টিকতা-আবেগ মিশ্রিত গল্প'। পরে বাংলাসাহিত্যে আঞ্চলিকতার অগ্রদূত হিসাবে 'কয়লাকুঠির' গল্প এবং সবশেষে 'গ্রামীণ ও নাগরিকজীবনভিত্তিক গল্প।'
শৈলজানন্দ যে মেসবাড়িতে থাকতেন সেই মেসবাড়ির মানুষের করুণ। জীবনকাহিনি নিয়ে বিখ্যাত গল্প "ধ্বংসপথের যাত্রী এরা"। রঙিন কাঁচের চশমায় জীবনকে না দেখে অন্য দৃষ্টিতে দেখতে চাওয়ার মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল এই গল্পটি। মেসবাড়ির এই অতিনগণ্য মানুষেরা সবাই জীবনসংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত এবং হারমানাদের দলে। এইসব মানুষদের নিয়ে কোনো বিপ্লবধ্বনি না তুলিয়েও শৈলজানন্দ একটি নীরব করুণ প্রতিবাদে সমস্ত গল্পটি স্পন্দিত করে রেখেছেন আশ্চর্য কুশলতায়। 'বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ' যেসব সৃষ্টি দিয়ে শুরু হয়েছে তার মধ্যে প্রধান একটি গল্প 'ধ্বংসপথের যাত্রী এরা'।
বহুমূল্য রত্নের মতো শৈলজানন্দের বিখ্যাত 'কয়লাকুঠির' গল্পগুলি থেকে 'বলিদান'কে নেওয়া হয়েছে। এই গল্পে লাকু মাঝি কয়লাখাদের আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হল। লাকুর, বৌ টগরী তাকে মাটিতে শুইয়ে রেখেছিল। সাহেবের কুকুরটা তাকে কামড়ে ছিঁড়ে মেরে ফেলল। তারপর লাকু মাঝি কয়লাখাদের ধ্বংসের মধ্যে তলিয়ে গেল। স্বামীপুত্রহারা টগরী তখন তার প্রিয় মুরগি 'লছমনিয়াকে'ও কয়লাকুঠির সাহেবের সামনে ফেলে দিয়ে বলল, সোনিয়াকে লিয়েছিস্, আমার লাকুকে নিলি, 'লছমনিয়াকে'ও লিয়ে নে সাহেব...। সাহেব সেই মুরগিকে দেখে বলল, "...All right, রোস্ট বানাও।"
চূড়ান্ত অমানবিক নিষ্ঠুরতা, হৃদয়হীনতা ও মালিকপক্ষের যুপকাষ্ঠে বলি হল লাকু মাঝি, সোনিয়া এবং টগরীর প্রিয় মুরগি 'লছমনিয়া'।
নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতি বেদনাবোধ, জীবন ও বাস্তব সত্যের প্রতি একনিষ্ঠাই শৈলজানন্দের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তথাকথিত আধুনিকতাকে পরিত্যাগ করে শৈলজানন্দ তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রথম পর্ব থেকেই বাংলা সাহিত্যকে প্রত্যক্ষ বাস্তবজীবনের প্রস্তরভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার সাধনায় ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি 'কল্লোলযুগের' প্রতিনিধিস্থানীয় লেখক হয়েও প্রকৃত কল্লোলীয় নন।
গ্রামীণ সমাজজীবনের অভাব, দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও অশিক্ষার জ্বলন্ত দলিল 'খুনিয়ারা' গল্পটি। গরিব ব্রাহ্মণ শ্রীহরি, স্ত্রী প্রসন্নময়ী, পুত্র গোবর্ধন (১৫ বছর) এবং মেয়ে টেবিকে (৫ বছর) নিয়ে যে সংসার পেতেছিল তা একদিন ছারখার হয়ে গেল। খাজনা-বাকির দায়ে জমিজমা, বসতবাটি সবই শ্রীহরি লিখে দিল জমিদারকে। তারপর প্রসন্নময়ীকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে এক অজানা ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করল। মেয়ে টেবি বিধবা হয়ে বাপের কাছেই মারা গিয়েছিল। পুত্র গোবর্ধন অবশ্য বাবা-মায়ের কথা না ভেবে শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীর কাছে চলে গেল। এক্ষেত্রে লেখকের অত্যাশ্চর্য নির্মম, নিরাসক্ত দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
কেরানিজীবনের অভাব, দারিদ্র্য, প্রেম-ভালোবাসা, শখ-আনন্দ-আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থ পরিণতির ছবি এঁকেছেন লেখক 'অকালবোধন' গল্পে। চারটি ছেলেমেয়ের পিতা প্রৌঢ় উপেনবাবু চাকরিসূত্রে কলিকাতায় মেসে থাকেন। যুবক ব্যোমকেশ উপনেবাবুর পাশেই থাকে, প্রেমপত্র লেখে। দেখাদেখি উপেনবাবুও স্ত্রী আশালতাকে প্রেমপত্র লিখলেন এবং জানালেন স্ত্রীকে এবার কলকাতায় এনে ১৫ দিন কাছে রাখবেন। চিঠি পড়ে লজ্জা পেলেও আশালতা খুশি হল। সত্যি সত্যিই উপেনবাবু আশাকে কলকাতায় আনলেন, দুজনে ঘুরে বেড়ালেন, কেনাকাটা করলেন, থিয়েটার দেখালেন। কিন্তু আশা যখন জানতে পারল যে তার স্বামী অফিস থেকে টাকা ধার করে এইসব করছে সঙ্গে সঙ্গে সে রাগে, দুঃখে, লজ্জায় তখনই গ্রামে ফিরে গেল। দারিদ্র্যের চাপে অসহায় কেরানির স্বপ্ন, সুখ ও আনন্দের 'অকালবোধনে'র ছবি এই গল্প।]
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি