নির্বাস ও অরণ্য রোদন

(0 পর্যালোচনা)
লিখেছেন/সম্পাদনা করেছেন
অমিয়ভূষণ মজুমদার
প্রকাশক দে'জ পাবলিশিং

মূল্য
₹250.00
পরিমাণ
মোট দাম
শেয়ার করুন

নির্বাস ও অরণ্য রোদন 

অমিয়ভূষণ মজুমদার 

'নির্বাস' উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৬৬ সনের (১৯৫৯) শারদীয় গণবার্তা-য়। লেখক অমিয়ভূষণ, ডাক-কেরানি ও শ্রমিক সংগঠক অমিয়ভূষণ, তখন একচল্লিশ, তাঁর নিজের ভাষায়, তখন 'জীবনের প্রদীপ্ত মধ্যাহ্ন'। ততদিনে তাঁর দুটি উপন্যাস গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। নীল ভূঁইয়া (পৌষ ১৬৬১), গড় শ্রীখণ্ড (চৈত্র ১৩৬৩)।

উপন্যাসের রচনাকাল সঠিক নির্দেশ করা সম্ভব নয়। পাণ্ডুলিপি নেই, খসড়া নোটও নেই কোথাও। এ অনুমানটা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে যে ১৯৫৯-এর পুজোর আগে উপন্যাসটা লিখেছিলেন গণবার্তা-র চিঠি পেয়ে। কারণ সাধারণত কোনো সম্পাদকের দিক থেকে লেখা পাঠানোর তাগাদা দিয়ে দিয়ে চিঠির পর চিঠি যখন আসতে থাকত তখন লিখতে বাধ্য হতেন অমিয়ভূষণ। তৈরি হয়ে ছাপতে যাওয়ার অপেক্ষায় কোনো লেখা পড়ে থাকত না। আবার এটাও মনে হয় যে, মনে হওয়াটা অযৌক্তিকও নয়, তার বহু আগে থেকেই মনের মধ্যে উপন্যাসটা তৈরি হচ্ছিল। ১৯৪৯-এর মাঝামাঝি বদলি হয়ে কৃষ্ণনগরে গেলেন, আর তারপর আঠারো মাস নানা জায়গায় ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষে ঘেঁষে ঘুরে ঘুরে চলল ডাকঘরের ইনস্পেক্টরি করা। সেই সময়ের কথা বলতে বলতে লিখেছেন, 'আরো উদ্বাস্তু দেখলাম। আরো মর্মন্তুদ যন্ত্রণা।' সেই যন্ত্রণার অনুভূতিই কি রূপ নিল নির্বাস উপন্যাসে? নিজেও তো উদ্বাস্ত অমিয়ভূষণ, দেশ হারানো, ঘর হারানো মানুষদের একজনই। কিন্তু অন্য উদ্বাস্তুদের সঙ্গে তাঁর পার্থক্যও ছিল। কুচবিহার শহরে তাঁর মা-বাপের নিজস্ব বাড়ি ছিল একটা। ফলে সত্যিকারের গৃহহীন হতে হয়নি। স্থায়ী চাকরি ছিল, তাঁর ও তাঁর ভাইদের। সরকারি সাহায্য, রেশন, ডোল, ক্যাম্প, পুনর্বাসনের জন্য একটুকরো দাক্ষিণ্যের মাটি, কিছুরই প্রয়োজন পড়েনি। হোক কষ্টেসৃষ্টে, তবুও উদ্বাস্তু-জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা তাঁদের পক্ষে তত কঠিন হয়নি, ক্যাম্পে ক্যাম্পে বাস্তুহারা সর্বহারা মানুষদের যত। নির্বাস উপন্যাস তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা-প্রসূত অভিব্যক্তি যে নয় এটা বলার প্রয়োজন নেই।

এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর চতুর্থ উপন্যাস। প্রথম দুটির উল্লেখ করা হয়েছে আগে। তৃতীয়টি ছিল দুখিয়ার কুঠি। উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, পত্রিকায় ছাপা হবার পরে, পত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে, ছাপা বই হয়ে উঠতে বেশি সময় নেয়নি শারদীয় গণবার্তা-য় প্রকাশিত দুখিয়ার কুঠি (১৩৬৪) ও নির্বাস। ১৩৬৬ সনে এই দুটি উপন্যাসই প্রকাশ করে অধুনালুপ্ত নিও-লিট পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। দুখিয়ার কুঠি প্রকাশিত হবার কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাস প্রকাশিত হয় ৯ই মাঘ ১৩৬৬ (জানুয়ারি ১৯৬০)। অপূর্ব অলংকরণ করেছিলেন খালেদ চৌধুরী। অসামান্য সেই শিল্পকর্মটির নিদর্শন বর্তমান সংস্করণে যুক্ত হল।

বইটির প্রথম সংস্করণের হাজার কপি ফুরিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

তথ্য এই যে, যাকে জনপ্রিয় লেখক বলে তা না হলেও অমিয়ভূষণের একটি পাঠকবৃত্ত ছিল, গুণগ্রাহী ছিল তৎকালীন বাংলাদেশে। আর অমিয়ভূষণের বই ছাপা হয়ে পড়ে থাকবে, লোকসানের ব্যাপারে দাঁড়াবে, এরকম আশঙ্কা সম্ভবত প্রকাশক মহলে ছিল না তত।

তা হলেও এটাও কিন্তু সত্যি নয় যে অমিয়ভূষণের নির্বাস প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বাঙালি পাঠকমহলে একেবারে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। সেরকম প্রশংসা ও সমাদরের প্রমাণ নেই। আলোচনা-সমালোচনাই বা কোথায়? বাংলা সাহিত্যের মান্য ইতিহাস গ্রন্থগুলিতেও তার উল্লেখ দেখছি না। বোধহয় এখন যেমন অমিয়ভূষণের সাহিত্য সম্বন্ধে 'দুরূহতা'র, দুর্বোধ্যতার অভিযোগ ওঠে, তখনো তাঁর ভাষা ও শৈলীর নতুনত্ব গড়পড়তা পাঠকের কাছে একই রকম দুরূহ ও দুর্বোধ্য মনে হত। সমকালের একটি সমালোচনায় অনিল চক্রবর্তী লিখেছিলেন, উপন্যাসটিকে বোঝার জন্য পাঠকের প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। কারণ বিমলার জীবনের ঘটনা, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি নিয়ে 'একটি গতানুগতিক সুখপাঠ্য এমনকী হৃদয়বিদারক উপন্যাস তৈরি করা খুব কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু মননশীল লেখক অমিয়ভূষণ সে পথে যেতে স্বভাবতই দ্বিধা করেছেন' এবং 'দুর্বোধ্যতার অভিযোগ যদি একান্তই আসে, তাহলে এইটুকু আমরা বলতে পারি যে, তার জন্য অমিয়ভূষণ দায়ী নন, দায়ী বাংলাসাহিত্যে মননধর্মী উপন্যাসের আশ্চর্য রকম অপ্রতুলতা।'

প্রথম থেকে দ্বিতীয় সংস্করণে পৌঁছুতে নির্বাস সময় নিয়েছিল সাঁইত্রিশ বছর। এরকম কি বলা যাবে যে তা বাঙালি পাঠকমনের পর্বান্তরের প্রমাণ। ১৯৯৬-এর জানুয়ারিতে পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত নতুন সংস্করণ বাজারে আনে দে'জ পাবলিশিং। পরে অমিয়ভূষণের রচনাসমগ্র-এর তৃতীয় খণ্ডে (দে'জ পাবলিশিং, জানুয়ারি ২০০৫) উপন্যাসটি গ্রন্থিত হয়েছে।

সমালোচনার কথা বলছিলাম। প্রকৃতপক্ষে দুটি সমালোচনা। প্রথমটি অনিল চক্রবর্তীর। 'কথাসাহিত্যের নবদিগন্ত' নামে ক্ষণজীবী পূর্বপত্র পত্রিকায় ছাপা। কোন বছরের কোন সংখ্যা সেটি, তা জানা যায়নি। কিন্তু প্রকাশকাল সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা করা যায় অমিয়ভূষণকে লেখা অনিল চক্রবর্তীর ৩০/৯/৬০ তারিখের চিঠি থেকে। পূর্বপত্র পত্রিকার প্রথম সংখ্যা (আষাঢ়-ভাদ্র ১৩৬৭) প্রকাশিত হয় ১০ই আগস্ট ১৯৬০-এ। এই সংখ্যাতেই সম্ভবত অনিল চক্রবর্তীর প্রবন্ধটি থাকার কথা ছিল। তিনি অমিয়ভূষণকে জানাচ্ছেন: 'পূর্বপত্রের অনুরোধে এবার 'নির্বাস' বইটির একটি দীর্ঘ সমালোচনা লিখে দিয়েছিলাম। কাগজের ১৩/১৪ পৃষ্ঠা হবে। কিন্তু ওরা এ সংখ্যায় ছাপেনি। স্থানাভাবই নাকি একমাত্র কারণ বলে ওরা জানিয়েছে। আগামীতে যদি নিতান্তই ছাপা হয়, নিশ্চয়ই মতামত জানিও।' ছাপা তো হয়েছিল কিন্তু পত্রিকা থেকে কাটা পৃষ্ঠাগুলিতে প্রকাশকালের হদিশ তো মেলে না। বহু বছর পরে প্রবন্ধটি এবং মুশায়েরা পত্রিকার অমিয়ভূষণ মজুমদার সংখ্যায় (১৪: ৪ মাঘ-চৈত্র ১৪২৪) পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

অপরটি হল ১৩৬৮ সনের শারদীয় গণবার্তা-য় পুলকেশ দে সরকারের প্রবন্ধ 'অমিয়ভূষণ আধুনিক সাহিত্যের ব্যতিক্রম'। এটিও সাম্প্রতিক কালে এবং মুশায়েরা পত্রিকার উল্লিখিত সংখ্যাতে পুনর্মুদ্রিত। এখানে অবশ্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি নয়, নির্বাস সম্বন্ধে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু মুদ্রিত হল।

সংযোজন আরেকটি আছে। সমালোচনা নয়, সেটিকে বোধহয় এই উপন্যাসের লেখকের জন্য একমাত্র পুরস্কার বললে যথার্থ বলা হবে। অমিয়ভূষণের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি-প্রাবন্ধিক অনিল চক্রবর্তীর 'নির্বাস' কবিতাটি ছাপা হয়েছিল উত্তরসূরী পত্রিকায় ১৯৬০-এ (৭: ৩ বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৬৭)। আকস্মিক ভাবে এটির সন্ধান পেয়েছিলাম রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পুরনো পত্রিকার সংগ্রহের মধ্যে থেকে। সুগভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও পাঠকক্ষের পাঠক-সহায়তাকারীদের প্রতি।

বর্তমান সংস্করণের শিরোনামেই প্রমাণ 'অরণ্য রোদন' নামে একটি গল্প এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। গল্পটি ইতিপূর্বে অমিয়ভূষণ মজুমদারের রচনাসমগ্র-এর দশম খণ্ডে (দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা, জুন ২০১২) গ্রন্থিস্থত। মুদ্রিত পাঠের সন্ধান পাওয়া যায়নি, গল্পটি পাণ্ডুলিপি থেকে সরাসরি রচনাসমগ্র-এ নেওয়া হয়েছিল। রচনাসমগ্র-এর দশম খণ্ডে 'রচনাপ্রসঙ্গ' অংশে (পৃ. ৫২০) যে তথ্য আছে তার সঙ্গে এটুকু যুক্ত করা যায় যে ১৯৭০ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত সময়কালে অমিয়ভূষণের রচনাপঞ্জি একের অধিক বার সংকলিত এবং প্রকাশিত হলেও তাতে এই রচনার উল্লেখ ছিল না এবং ১৯৯২ সালে প্রয়াত কবি-প্রাবন্ধিক সমীর চক্রবর্তী এটির প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্য উদ্ধার করেন। তাঁর মতে, এটি আলিপুরদুয়ার থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত দাবী পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ১৩৮৩-এর শরৎ অর্থাৎ ১৯৭৬-এ।

'অরণ্য রোদন'কে কি নির্বাস উপন্যাসের স্কেচ বলা যায়? বললে ভুল হয়তো হয় না। আর সেটাই তার এই নতুন সংস্করণে যুক্ত হবার কারণ।

এখানে একটা প্রশ্ন এই থেকে যাচ্ছে যে, এ যদি নির্বাস লেখার আগেই লেখা হয়, প্রকাশিত হয়নি কেন? (অবশ্য ১৯৭৬-এ দাবী পত্রিকায় সেটি পুনর্মুদ্রণের ঘটনাই ছিল কিনা তাও বলা কঠিন। তেমন হওয়াটাও অসম্ভব নয়। কারণ অমিয়ভূষণের প্রত্যেকটি প্রকাশিত রচনার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে এমন বলা যায় না) তখন তো নানা পত্র-পত্রিকায় অমিয়ভূষণের লেখার প্রবল চাহিদা। অনেক সময়ে পত্রিকাগুলির অনুরোধ রাখাই সম্ভব হত না। 

পর্যালোচনা ও রেটিং

0 মোট 5.0 -এ
(0 পর্যালোচনা)
এই বইয়ের জন্য এখনও কোন পর্যালোচনা নেই

সংশ্লিষ্ট বই

বই সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা (0)

প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য

অন্যান্য প্রশ্নাবলী

কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি