অমিয়ভূষণ রচনাসমগ্র (খন্ড - ১)
অমিয়ভূষণ মজুমদার
[নিজের কথা : আমার জীবন সমতলের হাঁটুজলের নদী। পার আছে, পারে ঘরবাড়ি, ধানের আর তিলের ক্ষেত, মেয়েরা জল নিতে আসে, রাতে গুলবাঘাও হয়তো, সূর্যোদয়-সূর্যাক্ত আছে, কিন্তু নিতান্ত সাধারণ, ভুলে যাওয়ার মতো ঢেউ ওঠে না, মধুকর ডোবে না, জলদস্যুদের বছর চলে না। জন্ম ২২ মার্চ ১৯১৮ (৮ চৈত্র ১৩২৪) বাংলা মতে শুক্রবার, আর ইংরেজিতে শনি, বোধহয় ভোররাতে নতুন দিন হওয়ার আগে বলেই এই দ্বিধা। স্থান মামাবাড়ি, দেশীয় রাজ্যের রাজধানী কোচবিহার শহরে। পিতামাতার চতুর্থ সন্তান। পিতৃভবন উত্তরবঙ্গের পাবনা জেলার পদ্মাপারের গ্রাম পাকুড়িয়া, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে।
বাবার ঠাকুরদা মথুরাপ্রসাদমশায় কী করে-বা একটা নীলকুঠি এবং সংলগ্ন জমিজিরাত হস্তগত করেছিলেন। আমার শৈশবের চোখে নীলকুঠির সেই দুর্গাকার বিস্তৃতি ও গড়ন, আধ-ইঞ্চি-পুরু লোহার পাতের দশ-এগারো ফুট দরজাগুলো এক-বুক উঁচু বাঁধানো নীল চৌবাচ্চার দেয়ালগুলো যার উপরে আরো ফুট-পাঁচেক গেঁথে তুললেই অনায়াসে হলঘর, শোবারঘর ইত্যাদি করা যায়, আর তা না-করলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের খুঁড়ে বার করা পরিচ্ছন্ন ধ্বংসাবশেষের সাজানো-গোছানো একজিবিট, যার ফলে দুর্গর কল্পনাটাই বাড়ে; পুরনো দু'একটা তরোয়াল, ঢাল, ঢোলকাকার, ঢাকাকার, প্রকাণ্ড করবীফুলের আকার কাচের চিমনিগুলো, দু-তিন কেজি তেল ধরে এমন প্রকাণ্ড হিংকসের হারিকেন লণ্ঠন-এসবই অবাক হওয়ার মতো বোধ হতো। সেই বাড়িতে আমার সমবয়সী যারা ছিলো তাদের মনে এরকম হতো কিনা, তা বলতে পারছি না। তুলনায় মামাবাড়ি বেশ ছোটোখাটো। বাড়ির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার মতো বাগান, পুকুর এসব তো ছিলোই না, বাঁধানো সুরকির রাস্তার ধারে খোলামেলা আর আধুনিক। ১৯২৬ পর্যন্ত বছরে দু-তিনবার সেই গ্রাম আর সেই শহরের মধ্যে যাওয়া আসা চলতো। এই শহরের পথে ঘোড়াগাড়ি চলে, দু'একখানা মোটরগাড়ি চলে, প্রকাণ্ড সুন্দর ঘোড়ায় চড়ে কোনো কোনো মানুষ, বীথিকাকার সড়ক দিয়ে হাতি চলে।
অবাক লাগা আর কল্পনা দিয়ে সেই অবাক লাগাকে বিশ্লেষণ করা এক নয়। কল্পনা পরে আসে। তফাৎগুলোও স্পষ্ট হয় না। তখনো আমার পৃথিবী মা'র মুখ, মা'র বুক, মা'র সুন্দর মার্কলহেন দু'খানা হাত।
১৯২৬-এ পরপর কয়েকটা ঘটনা ঘটে, যেগুলোকে ঘটনা বলে কিনা সন্দেহ আছে। আমার এক ভায়ের চিকিৎসার জন্য পাকুড়িয়া থেকে পাবনায় যাচ্ছিলাম আমরা। পদ্মা বেয়ে স্টিমারে। সন্ধ্যায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। ঝড় উঠে পড়েছিলো; গোটা রাত এক আতঙ্কের আবহাওয়ায় কাটিয়ে ভোররাতে পাবনায় পৌঁছেছিলাম। সেই ঝড়ের ধাক্কা যা যেন স্টিমারটাকে শূন্যে তুলে ফেলবে, যা এক অদ্ভুত কারণে একইসঙ্গে রাগে গজরাচ্ছে আর আর্তনাদ করছে, সেই বৃষ্টিধারা যা পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত একটা নীলচে সাদা দেয়াল, সার্চলাইট যার এখানে-ওখানে পড়ে যেন পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে, স্টিমারের সেই ভাঙা-গলার আর্তনাদ। ভীত, ত্রস্ত যাত্রীদল যারা আতঙ্কে ছুটোছুটি করে স্টিমারের ভারসাম্যকে টলিয়ে দিচ্ছে আরো, যাদের স্থির রাখতে মৃদু লাঠি চালনা করছে মাল্লারা, তারা নানা প্রার্থনা করছে। দোতলার ডেকে তখন মা বললেন, যদি সত্যি ডোবে। বাবা গম্ভীর মুখে বললেন, আবার সাঁতরে পার হতে হবে পদ্মা। তখন সেই ডেকে একটা চাদর বিছিয়ে মাকে ধরে আমরা চার ভাইবোন শুয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙেছিলো ভোর হতে, পাবনার ঘাটে পৌঁছে। সেই ঝড়ের পদ্মায় কারো পক্ষেই চারটি শিশু ও তাদের মাকে নিয়ে সাঁতরে পার হওয়া সম্ভব হতো কিনা জানি না। কিন্তু আমার একটা প্রত্যয় আছে পুরুষের ঈশ্বর-নির্দিষ্ট একটাই যুক্তি আছে অস্তিত্বের সন্তানদের রক্ষা করা। প্রত্যয়টা সেই রাত থেকে উঠেছে। দ্বিতীয় ঘটনা আমার সেই কঠিন অসুখ যার সূচনা পাবনা শহরের সেই সাময়িক প্রবাসে যার জন্য আমাকে মাস তিন-চার কলকাতার ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিনে পাইকপাড়া ওয়ার্ডে থাকতে হয়েছিলো। যেখানে কর্নেল নেপিয়ার ছিলেন কর্তা। সেখানে তখনই ভর্তি না-হতে পারলে বাঁচার আশা ছিলো না। অথচ কর্নেল নেপিয়ার একবার চোখ টেনে দেখে, বার দুয়েক পেট টিপে ভর্তি করে নিয়েছিলেন। না, তার জন্য তাঁর চেম্বারে গিয়ে ভিজিট দিতে হয়নি, এমনকী তাঁর কোনো অ্যাসিস্ট্যান্টকে ধরেও তাঁর কাছে পৌঁছাতে হয়নি। সে-সময়ে এক রাতে, খুবই কষ্টের সে-রাত, মোহাচ্ছন্নই যেন ছিলাম। নার্সরা আসা-যাওয়া করছে এরকম অনুমান ছিলো। সেই হলে তো মাঝেমাঝেই মৃত্যু ঘটছিলো। সে রাতে কি আমারও মৃত্যু হবে? মৃত্যু কী? না-থাকা বুঝতে পারছি। স্ক্রিন দিয়ে বেডটাকে ঘিরে দেয়, পরে আর সেই রুগীকে দেখা যায় না। চোখে জল ছিলো বোধহয়: নিঃশব্দ কান্নার, উদাস ব্যথার, ভয়ের। সেই সময়ে সারারাতে এক মেম-নার্সকে বিছানার পাশে দেখেছিলাম। ধবধবে রং, হাসলে মুখ লাল হয়, নাকের ডগাটা একটু উল্টানো, নীলে-সবুজে মিশানো চোখ। এ সে নয় যার আটটায় ডিউটি শুরু হয়েছিলো। এর ডিউটি বরং আটটায় শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। যাই হোক, আমি তখন থেকে সেই নার্সটিকে যাকে মনে-মনে এখনো 'দিদি' বলি এবং কর্নেল নেপিয়ারের কাছে কৃতজ্ঞ থেকে গিয়েছি। হয়তো সেজন্যই আমার ইংরেজি সাহিত্য ও ভাষার প্রতি ভালোবাসা আছে। এরকম প্রত্যয় আছে আমার-শোষণ ব্যবস্থার অংশ হলেও, তার হিস্যাদার হলে-মানুষের ভ্যালুস এবং মর্যালিটিকে শোষণ ব্যবস্থার সৃষ্টি বলা যায় না সবক্ষেত্রে। তৃতীয় ঘটনাকেও গুরুত্ব না-দিয়ে পারছি না। ১৯২৬-এই বোধহয় ঠনঠনে কালীবাড়ি আক্রান্ত হয়েছিলো। ঢাকাতে দাঙ্গা হচ্ছিলো। আমাদের গ্রামে সেই দাঙ্গা এসে পড়তে পারে এরকম সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছিলো। বড়দের ক্রোধ ও আশঙ্কার আলাপ শুনছিলাম। রামদা, তরোয়াল, সড়কিতে ধার পড়ছিলো। বাবা বন্দুক কিনে আনলেন, কয়েক বাকসো পিতলমোড়া বুলেট। অনেকদিন রাতে বাবা বন্দুক হাতে গ্রাম ঘুরতে বেরোতেন। শুনতাম ওরা হিন্দুদের কেটে ফেলে, হিন্দু মেয়েদের চুরি করে। মার মুখ শুকনো, বাবার মুখ গম্ভীর। কখনো নিজেদের টডের গল্পের রাজপুত মনে হতো। ১৯৪৬-৪৭ পর্যন্ত এরকম একটা বিদ্বেষ ও ক্রোধ ছিলো মনে। ফলত সেই সব রাজনীতিক যারা দেশভাগের জন্য কংগ্রেস দলকে দোষ দিয়ে উদ্বাস্তু-ভোট টানবার প্রয়াস করে চলেছে তাদের চিন্তাকে মিথ্যাশ্রয়ী মনে হতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় মুক্তিফৌজের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য উপহার ইত্যাদি নিয়ে রংপুর জেলার খানিকটা গিয়েছিলাম, এপারে আশ্রয়-নেয়া মুক্তিফৌজের সঙ্গে সভা-সমিতি করেছি, কিন্তু এপার বাংলা-ওপার বাংলা বলার মতো বালসুলভ ইউফোবিয়া কখনো বোধ করিনি। ওরা ভাষার জন্য প্রাণ দিচ্ছে, নিজেদের স্বকীয়ত্ব বাঁচাতে লড়ছে, পৃথক হয়ে গেলেও আমাদের জ্ঞাতিগোত্রই, পদ্মা যদি প্রাণপ্রবাহ, তবে তাকে ধরে ওরা আর আমরা এক-এসব বোধ ছিলো, তাই বলে এক হয়ে গেলাম-এরকম সর্বনেশে কাব্যিক ভাব, কখনো মাথায় ঢোকেনি। কখনো মনে হয়নি আবার ওপারে ফিরবো। বরং মনে করি অন্যায় যদি হয়ে থাকে এই ভাগাভাগি দিয়ে অন্যায় শোধ হলে কম্যুনাল রাজনীতির ধোঁয়াশায় পথ হাতড়াতে হবে না; বোঝা যাবে আমরা এবং ওরা শুধু রবীন্দ্রনাথের নয়, সেই কবে থেকে মনসামঙ্গলেরও শরিক।
কিন্তু এসবের পরপরই আমার জীবনের সবচাইতে বড়ো ঘটনাগুলোর একটা ঘটে গেলো কোচবিহার শহরে জেল্কিনস্ স্কুলে, ১৯২৭, সেভেন্থ ক্লাস (ক্লাস ফোর)-এ ভর্তি হলাম। আমার মামা আমাকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলেন। তিনিই সঙ্গে করে নিয়ে ভর্তি করে দিলেন। আমার পাবনা জেলা থেকে কোচবিহার রাজ্যে চলে আসার ব্যাপারে বাবা-মা এবং মামা নিশ্চয় পরামর্শ করেছিলেন তাদের সে-পরামর্শ জানার কথা নয়, আমি বুঝেছিলাম (আজকালকার বুলিতে যাকে মডেল স্কুল বলা যেতো) কোচবিহারের এই গুরুত্বপূর্ণ এবং মা'র প্ল্যান তা বুঝতে পারি। আমি চলে আসার বছর দুয়েক পরে বাবা সপরিবারে কোচবিহার চলে আসেন এবং বাবা প্রায় চল্লিশ বছরে চাকরিতে ঢুকে যান কোচবিহার শহরে। তখন অবশ্যই এসব খতিয়ে দেখার ইচ্ছা, চেষ্টা, বুদ্ধি কিছু ছিলো না। আমি যা অনুভব করতাম তা সুখ। তার কারণ (আমার কাছে তখন) দাদামশায়, দিদিমা এবং মামার ভালোবাসা, স্কুলের বন্ধুবান্ধবদের ভালোবাসা আর যেন চারিদিকের রঙিন আলো-আলো ভাব। এখন ভাষা দিতে পারি আমার সেই অব্যক্ত প্রীতির, তাই বলতে পারি এখন শহরের আধুনিকতা, আমার দাদামশায় আর মামা দুজনেই উকিল যা জমিজিরাত খাজনা আদায়ের তুলনায় আধুনিক, যাঁদের কাছে সময়ের দাম ছিলো, বাড়ির সকলের বই পড়া, কাগজের খবর রাখা, আদালত কোর্ট, সরকারি অফিস, রেলস্টেশন, হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, ব্রাহ্মামন্দির, পথে ব্যক্তসমস্ত মানুষের যাতায়াত, ঘোড়াগাড়ি, কচিৎ মোটরগাড়ি, বড়ো বড়ো সুন্দর ঘোড়া, হাওদাদার হাতি, রাজবাড়ির মারফত ১৯২৭-এই, ১৯২৭-এর, লন্ডনের হালচালের গল্প ছড়িয়ে পড়া, দিদিমার বই পড়া, বই লেখা, সভা-সমিতি করা, ব্রাহ্মমন্দিরে যাওয়া, তাবিজ-কবজ মানত-না-মানা ঈশ্বর আছেন কিংবা নেই, থাকলে তাঁর চেহারা আছে কিনা-এসব আলাপ, মামার সঙ্গে বসে সেই ১৯২৭-এই রবীন্দ্রনাথের গান শেখা, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সঙ্গে অতুলপ্রসাদ, ডি এল রায়ের গানও, আর স্কুল, কলেজ, বেলা দশটায় ছাত্রছাত্রীতে পথঘাট ভরে যাওয়া, আর ক্রিকেট, টেনিস। আর, এইসব আধুনিকতার সঙ্গে যা চোখে লেগেছিলো তা সৌন্দর্য-রূপ। সোজা সোজা প্ল্যান করে পাতা লাল সুরকির পথ যার দুপাশে বড়ো বড়ো গাছ পথগুলোকে বীথি করে রেখেছে। সেই যে রূপের ফাঁদে পড়া তার থেকে আর মুক্তি নেই।....
প্রবেশ করুন বা রেজিস্টার করুনআপনার প্রশ্ন পাঠানোর জন্য
কেউ এখনো কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেননি